অভিনেত্রী শাবানা। যার নামের পাশে আর বিশেষ কোনো বিশেষণের প্রয়োজন হয়না। শাবানা মানেই যেনো বর্ণিল ইতিহাসের পান্ডুলিপি। মাত্র আট বছর বয়সে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে শি’শু শিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করেছিলেন। এরপর ‘চকোরী’ ছবিতে নায়িকা চ’রিত্রে। বাকিটা ইতিহাস। একের পর এক হিট ছবি।

প্রায় ২০ বছর হল চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি। স্বামী সন্তান নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অব’স্থান করছেন ঢাকাই ছবির এই মিষ্টি নায়িকা। মাঝে-মধ্যে দেশে আসেন তিনি। তবে চলচ্চিত্র থেকে শাবানা বিদা’য় নিলেও তার জায়গা আজও কেউ নিতে পারেননি। এখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো ভালো প্রযু’ক্তির ব্যবহার হয়, কিন্তু সেই সাদা কালো যুগের শাবানাকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেননি। পারবেওনা হয়তো।

স’ম্প্রতি ঢাকায় এসেছেন শাবানা। সোমবার তার বাসায় গণমাধ্যমক’র্মী দের সাথে প্রা’ণখু’লে আড্ডা দিলেন এ অভিনেত্রী। যে আড্ডায় জা’নালেন অনেক না বলা কথা। রোমন্থন করলেন অতীত স্মৃ'তি।

দর্শকদের হৃদয়ে থাকলেও গত দুই দশক ধ’রে সিনেমা’র পর্দায় নেই শাবানা। প্রবাস জীবন কিভাবে কাটছে কিংবদন্তি এ তারকার? ভক্তদের মনে এ প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের। আড্ডায় সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন শাবানা। বলেন, আমি তো এখন পুরোপুরি পারিবারিক মানুষ। পরিবার নিয়েই সময় কাটে।

নাতি-নাতনিতের নিয়ে খেলাধুলা করে ওদের স’ঙ্গে আড্ডা দিয়েই সময় পার করি। ওরাই এখন আমা’র একমাত্র খেলার স’ঙ্গী। এছাড়াও ধ’র্ম ক’র্ম পা’লন করছি। রোজা নামাজ ক’রতে ক’রতে দিন কে’টে যায়। মাঝে মাঝে দেশে আসছি। আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা হচ্ছে। সিনেমা’র পুরোনো মানুষজনদের সাথেও দেখা হচ্ছে। তাদের স’ঙ্গে ও সময়টা ভালো কাটে।’

প্রতিটি মানুষের জীবনেরই অতীত থাকে। সেই অতীতটা ভালোমন্দ মিলেই। সাধারণত মানুষ তার জীবনে অতীতের সুন্দর সময়টাকেই মিস করে বেশি। শাবানা অতীত জীবনের কোন বিষয়টি মিস করেন এমন প্রশ্নের জবাবে শাবানা বলেন, একদিন কত সুন্দর সময় গেছে আমাদের। কত ব্যস্ততা মাথায় নিয়ে বাসায় ফি’রেছি।

মাসের ত্রিশ দিনই ক্যামেরার সামনে শু’টিং করেছি। শু’টিং শেষে পরের দিনের শু’টিংয়ের আবার প্র’স্তুতি। সেসব দিনগুলোতে খুবই মিস করি। সেই স’ঙ্গে দেশের মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। এখন যখন দেশে আসি রাস্তায় কোনো মানুষ যদি আমাকে দেখে তাদের চোখে মুখে যে আনন্দ ও তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠে সেটা ভাষায় বলে বোঝাতে পারবো না।

সিনেমা’র সোনালী দিন নেই আর। ১২শ’ থেকে হল কমে এসে দাড়িয়েছে অর্ধশতকে। বিষয়টি জা’নাতেই অ’বাক ১১ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এ নায়িকা। সর্বশেষ ২০১৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। আগামী মাসের শুরুতেই আমেরিকায় উড়াল দেবেন শাবানা। যাওয়ার আগে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির হাওয়া বদল হবে এটাই প্রত্যাশা রাখলেন।

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শাবানা স’ম্প্রতি দেশে ফি’রেছেন। স’ঙ্গে আছেন স্বামী চিত্রপ্রযোজক ওয়াহিদ সাদিক। দেশে ফি’রেই সাংবাদিকদের মু’খোমুখি হয়েছিলেন এক সময়ের সাড়া জাগানো এই নায়িকা। কথা বলেছেন অভিনয় জীবন ও অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে।

চলচ্চিত্র জগতে শাবানার ছিল নিজস্ব অব’স্থান। পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে যথেষ্ট সচে’তন ছিলেন তিনি। সাংবাদিকদের স’ঙ্গে কথা বলার মুহূ’র্তে সে কথা স্মরণ করান অভিনেত্রী। পোশাক নিয়ে তিনি বলেন, আমি পোশাকের ব্যাপারে খুব সচে’তন ছিলাম। একবার ‘বধূ বিদা’য়’ ছবিতে গ্রামের মেয়ের চ’রিত্রে অভিনয় করার জন্য প্রস্তাব পাই। পরিচালক আমা’র চরিত্র সাজান গায়ে শুধু একটা শাড়ি পরে অভিনয় করার মতো করে। আমি না করেছিলাম। তখন পরিচালক আমায় শহরের মেয়ের চ’রিত্র দিয়েছিলেন।

ছবির গল্প ও চ’রিত্র নিয়ে অভিনেত্রী বলেন, আমি সব সময় গল্প ও চরিত্র নিয়ে ভাবতাম। কোথাও শু’টিংএ গেলে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম। পরিচালক ও নায়ক নিয়ে অতোটা ভাবতাম না। আমি চাইতাম ছবিতে আমা’র চরিত্রটা ভালো হোক।
চলচ্চিত্র জগতের প্রথম দিনের স্মৃ'তি হাতড়ে অভিনেত্রী বলেন, আমা’র প্রথম ছবির ডায়ালগ এখনও মনে আছে। ওই ছবিতে রওশান আরা নায়িকা ও নায়ক ছিলেন রহমান। আমা’র ডায়ালগ ছিল- ভাইয়া ভাইয়া, আপুর বিয়ে। খুশিতে দৌড়ে এসে ভাইয়াকে ধ’রি। ভাইয়া আমাকে ধ’রে বলেন, তাই নাকি রে। এক বারেই পারফেক্ট শট দিয়েছিলাম।

এখনও একটা আফসোস অভিনেত্রীকে তাড়া করে। অভিনেত্রীর শেষ ইচ্ছে ছিল বেগম রোকেয়ার জীবন ভিত্তিক সিনেমায় অভিনয় করা। কিন্তু নানা প্রতিব'ন্ধকতার কারণে অভিনয় করা সম্ভব হয়নি। অভিনেত্রী বলেন, ছবিটা ক’রতে পারলে আরও ভালো লাগত। একটা আফসোস থেকে গেছে। সুভাষ দত্তের স্বপ্ন ছিল আমাকে নিয়ে চলচ্চিত্রটা করার। কিন্তু আর হলো না।

শাবানার পারিবারিক নাম আফরোজা সুলতানা রত্মা। চলচ্চিত্রে তিনি শাবানা নামেই সুপরিচিত। মাত্র আট বছর বয়সে সিনেমায় নাম লেখান শাবানা। এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ নামের ছবিতে তিনি শি’শুশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ‘চকোরী’ ছবিতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। বাংলা ও উর্দু ভাষায় নির্মিত ‘চকোরী’ ছবি ব্যবসা সফল হয়। এরপর থেকে শাবানাকে আর পেছন ফি’রে তাকাতে হয়নি।

তিন যুগের অভিনয়জীবনে শাবানা অভিনীত সিনেমা’র সংখ্যা ২৯৯টি। ক্যারিয়ারে নাদিম, রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, জসীম, সোহেল রানার স’ঙ্গে জুটি বেঁধে শাবানা উপহার দেন জনপ্রিয় অনেক ছবি।

তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে আছে, ‘চকোরী’, ‘ভাত দে’, ‘রাঙা ভাবী’, ‘অবুঝ মন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দোস্ত দুশ’মন’, ‘সত্য মি’থ্যা’, ‘রাঙা ভাবী’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘ওরা এগারো জন’, ‘বি’রো’ধ’, ‘আনাড়ি’, ‘সমাধান’, ‘জীবনসা’থী’, ‘মাটির ঘর’, ‘লুটেরা’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কেউ কারো নয়’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘দুঃসাহস’, ‘পুত্রবধূ’, ‘আ’ক্রোশ’ ও ‘চাঁপা ডাঙার বউ’ ইত্যাদি।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে শাবানা দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালে শাবানা অজা’না কারণে হঠাতই বিদা’য় নেন চলচ্চিত্র থেকে। স্বামী সন্তানদের নিয়ে ২০০০ সাল থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে বসবাস করছেন তারা।